
গত শতকের কোনো এক সময়ে, আমার প্রমাতামহ—চোখে স্বপ্ন আর মনে অনেকখানি উচ্চাকাঙ্ক্ষা নিয়ে, পরিবারের সঙ্গে নতুন করে জীবন গড়ার আশায় সিলেট ছেড়ে কলকাতায় চলে এসেছিলেন।
তখনও অবিভক্ত বাংলার মানচিত্র অক্ষত।
হাওড়ার এক শান্ত, নিরিবিলি কলোনিতে যখন তিনি সংসার পাতলেন, সঙ্গে করে নিয়ে এলেন পূর্ববঙ্গের স্বাদ আর স্মৃতি।
কিন্তু শহরের মতো রান্নাঘরও তো নিজের চারপাশের স্বাদ থেকে পুরোপুরি আলাদা থাকে না।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নতুন কিছু স্বাদও নিঃশব্দে ঢুকে পড়ল সেই রান্নাঘরে, প্রায় অগোচরে।

আমার প্রপিতামহের তৃতীয় কন্যা, আমার দিদু। হাওড়ায় বেড়ে ওঠা সেই মেয়েটির বিয়ে হল দূর করিমগঞ্জে। সঙ্গে করে নিয়ে গেলেন সিলেটের পৈতৃক বাড়ির স্মৃতি, শৈশবের চেনা স্বাদ আর হাওড়ার রান্নাঘরে তাঁর মায়ের আপন করে নেওয়া নতুন সব রান্নার প্রণালী।
করিমগঞ্জের সেই রান্নাঘরে দিদু দুই বাংলার নানা কায়দা মিলিয়ে নিজের মতো করে রান্না করতে থাকলেন।
হাওড়ার দিনগুলোর নরম, মায়ামাখা স্মৃতির সঙ্গে মিশে গেল সিলেটের রান্নার সেই তীব্র, সহজাত স্বাদ। আর সেই মেলবন্ধন থেকেই ধীরে ধীরে তৈরি হল দিদুর নিজস্ব এক রান্নার জগৎ।
দিদুর রান্নার হাত ছিল অসাধারণ। অন্তত গরমের ছুটিতে মামাবাড়িতে গিয়ে দাদার আর আমার খাবারের থালা দেখলে সে বিষয়ে কারও কোনো সন্দেহ থাকত না!
মা দিদুর বড় মেয়ে।
তাই দুই মাসি আর তিন মামুর চোখের মণি ছিলাম আমরা দুজনে।
আদর-আবদারের কোনো শেষ ছিল না। আর মামাবাড়ি আমাদের কাছে ছিল সেই ছোট্টবেলার কবিতার মতোই—
তাই তাই তাই
মামার বাড়ি যাই,
মামার বাড়ি ভারি মজা
কিল চড় নাই।
সেই গরমের ছুটিগুলো কতকাল আগের কথা! অথচ কত স্মৃতি আজও যেন চোখের সামনে ভাসে। আর ঠিক তেমনই, এত বছর পরেও দিদুর হাতের রান্নার সেই স্বাদগুলো রয়ে গেছে স্মৃতিতে, একেবারে অটুট।
নারকেল পোস্ত কাতলা, ডিমের সাদা চচ্চড়ি, পাটিসাপটা তরকারি—কত রকমের রান্না যে হত দিদুর রান্নাঘরে! একেকটা পদের সঙ্গে জড়িয়ে আছে একেকটা স্মৃতি।
সেই সব অসাধারণ রান্নার মধ্যে আমার বিশেষ প্রিয় ছিল হাতমাখা ঘি তোপসে।

দিদু নেই আজ বহু বছর হল।
তাঁর সেই রান্নাঘরও আর নেই।
তবু কিছু কিছু স্বাদ আজও ফিরে আসে, মনের অলিগলি বেয়ে। কখনও কোনো চেনা গন্ধে, কখনও নিজের রান্নাঘরে দিদুর কোনো পদ রাঁধতে গিয়ে। বারবার স্মৃতিমেদুর এক রূপকথা হয়ে।

হাতমাখা ঘি তোপসে
Ingredients
Method
- প্রথমে একটি প্যানে ঘি গরম করে পেঁয়াজকুচি হালকা সোনালি করে ভেজে নিন। ভাজা পেঁয়াজের সঙ্গে একটি পাকা লাল লঙ্কা দিয়ে একটু আধবাটা করে নিন।
- এবার একটি ভারী তলার প্যানে ভালো করে জল ঝরিয়ে মুছে রাখা তোপসে মাছগুলো নিন। তাতে বেটে রাখা পেঁয়াজ-লঙ্কা, আদার রস, বাকি পাকা লাল লঙ্কা, হলুদ গুঁড়ো, স্বাদমতো নুন ও ১ টেবিল চামচ ঘি দিন।
- এবার হাত দিয়ে বেশ ভালো করে সমস্ত উপকরণ মাছের সঙ্গে মাখিয়ে নিন।
- প্যানটি একেবারে কম আঁচে বসিয়ে দিন। মাঝে একবার খুব সাবধানে মাছগুলো উল্টে দিন, যাতে ভেঙে না যায়। মাছ পুরোপুরি সেদ্ধ হতে মোটামুটি ১০–১২ মিনিট সময় লাগবে।
- মাছ রান্না হয়ে গেলে বাকি ঘি ছড়িয়ে দিয়ে প্যানটি ঢেকে আঁচ বন্ধ করে দিন।
- গরম গরম ভাতের সঙ্গে পরিবেশন করুন হাতমাখা ঘি তোপসে।
হাতমাখা ঘি তোপসে। পাকা লঙ্কার ঝাঁজ আর ঘিয়ের সুবাসে মাখামাখি এক অনবদ্য পদ। আমার দিদুর রান্নাঘরের স্মৃতিমাখা এক হারিয়ে যাওয়া স্বাদ






Leave a Reply