
ঢাকের বাদ্যি থেমে গেছে। উমা ফিরে গেছেন কৈলাসে।
উৎসবের কোলাহল মিলিয়ে গেছে।
বাতাসে এক অদ্ভুত মনখারাপ করা বিষণ্ণতা ।
আর সাথে ভেসে আসে ছাতিম ফুলের গন্ধ।
কংক্রিটের এই শহরে, উঁচু বাড়ি আর ব্যস্ত রাস্তার ভিড়েও শরতের সেই চেনা গন্ধ আমায় ফিরিয়ে নিয়ে যায় করিমগঞ্জের সেই বাড়িতে।
বিজয়ার রেশ তখনও পুরোপুরি কাটেনি, তারই মধ্যে এসে পড়ে কোজাগরী লক্ষ্মীপুজো।
লাল মেঝেতে এককোণে বসে বামমা নারকেল কুরে কাঁসার রেকাবিতে রাখছে । পাশের বেতের ঝুড়িতে রাখা আরও অনেকগুলো নারকেল।
আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম , “এত নারকেল কেন গো?”
“কোজাগরী পুজো হবে যে, তাই তো এত আয়োজন!”
আমি ঝপ করে পাশের পিঁড়িতে বসে পড়লাম ।
“ও বামমা, তোমার ছোটবেলাকার কোজাগরী পুজোর গল্প বলো না, আমি শুনব।”

বামমা বলতে শুরু করলো-
কোজাগরী পূর্ণিমা । ঘরে ঘরে বরণ করা হতো মা লক্ষীকে। কোথাও সরা, কোথাও প্রতিমা, কোথাও ধানের শিষ বা ধান ভরা ঘট সাজিয়ে। রূপ আলাদা হলেও আরাধনার মূল কিন্তু এক।
মা লক্ষ্মী তো অন্নের, শস্যের দেবী। তাই তিনি ধানক্ষেতে, ধানের গোলায়, নতুন চালে, ভাঁড়ারঘরের আনাচেকানাচে সর্বত্র বিরাজমান ।

গোলাভরা ধান আর ভরা সংসারের কামনায় যে পুজো, তার নৈবেদ্যেও যেন ধরা থাকত মাটির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক।
ধান, চাল, খই-চিড়া , শুধু রান্নাঘরের সামগ্রী ছিল না, ছিল লক্ষ্মীর আরাধনারও একটি প্রধান অংশ।
কলা গাছ দিয়ে নৌকা বানিয়ে তাতে দেওয়া হত নানা ধরনের শস্য, ধান , সিঁদুর, দূর্বা ইত্যাদি ।
সদ্য কাটা ধানের শিষ, যার গায়ে তখনও হয়তো মাটির সোঁদা গন্ধ লেগে আছে, সাজিয়ে রাখা হতো পুজোর উপকরণের পাশে।
উঠোন নিকিয়ে দেওয়া হতো আলপনা । লক্ষী ঠাকুরের ঠাকুরের সামনে , ঘরের মেঝেতে তে বটেই, ধানের গোলার সামনেও।
কী আশ্চর্য দক্ষতায় একবাটি পিটুলিতে আঙুল ডুবিয়ে সাদা রেখার পর রেখা আঁকত আমার মা-কাকিরা।
কখনও পদ্মফুল। কখনও লতাপাতা।
কখনও বৃত্তের মধ্যে বৃত্ত।
সিঁদুরের কৌটা , লক্ষ্মী-পেঁচা , ধানের ছড়া , আয়না, চিরুনি আর আরও কত কিছু ।
লক্ষ্মীর পদচিহ্ন তো বটেই ।
সদর দরজা থেকে শুরু করে উঠোন পেরিয়ে, ঘরের ভিতর দিয়ে, একেবারে ঠাকুরের আসন পর্যন্ত এগিয়ে যেত সেই শ্বেতশুভ্র পদচিহ্নের সারি।

আলপনা সৌজন্য -বাংলার ব্রত অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আমরা ছোটরা ভারী কৌতূহল নিয়ে সেই পায়ের ছাপ অনুসরণ করতাম, ঠিক তোর মতো।
আর মনে মনে ভাবতাম, সত্যিই কি ওই পথ ধরে আসবেন মা লক্ষ্মী?
এই পূর্ণিমার রাতে দেবী যখন ঘরে ঘরে ঘুরে বেড়ান, বাহন লক্ষ্মীপেঁচাও নাকি তাঁর সঙ্গে থাকে।
আমরা তাই কান খাড়া করে থাকতাম।
দূরে কোথাও অচেনা পাখির ডাক শুনলেই চমকে উঠে ভাবতাম- ওই কি লক্ষ্মীপেঁচা ডাকল?
মা লক্ষ্মী কি তবে এসে পড়েছেন?
বাইরের পৃথিবী আর ধানখেত যখন জ্যোৎস্নাস্নাত,
আকাশ ছেয়ে নামতো এক মায়াবী রূপালি রাত।
উলুধ্বনি আর শঙ্খধ্বনিতে চারপাশ মুখরিত,
আলপনা আঁকা ঘরের দাওয়ায় জ্বলে উঠতো প্রদীপ।
ঠিক তখনই কোজাগরী পুজোর হতো শুরু।

ফলমূল, নারকেল, খই, নাড়ু আর চাল-কলা,
সাবু কত রকমের যে নৈবেদ্য।
আমার মা ঠাকুমারা কত কী বানিয়ে রাখত,
জেগে জেগে সেই আগের রাতভর!
নানা ধরনের নাড়ু—গঙ্গাজলি নাড়ু, সরের নাড়ু,
মিষ্টি সুবাসে মাখানো ক্ষীর গোল্লা নাড়ু;
তাছাড়া চিঁড়ার মোয়া, খৈ উপড়া, চিঁড়ার উপড়া,
ঢ্যাপের খইয়ের মোয়া।
বামমার গল্প শুনতে শুনতে আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম , “কই, তুমি তো কখনও ক্ষীরের গোল্লা নাড়ু বানাওনি!”
বহু শরৎপূর্ণিমা পেরিয়ে আজও কংক্রিটের এই শহরে কোজাগরীর রাতে, যখন আকাশজুড়ে শুভ্র জ্যোৎস্না আর বাতাসে হিমের পরশ মেলে, আমার মন চায় ক্ষীরের গোল্লা নাড়ু হেমন্তলক্ষীর ভোগের থালায় সাজিয়ে দিতে।

ক্ষীরের গোল্লা নাড়ু
Ingredients
Method
- দুধ জ্বাল দিয়ে ঘন করে নিতে হবে। ক্রমাগত নাড়তে হবে, যাতে তলায় ধরে না যায়। দুধের জলীয় অংশ শুকিয়ে ক্ষীর যখন বেশ ঘন, শুকনো অথচ নরম মণ্ডের মতো হয়ে আসবে, তখন নামিয়ে ঠান্ডা করে নিতে হবে।
- ক্ষীরের সঙ্গে চালের গুঁড়ো ও চিনি মিশিয়ে ভালো করে মেখে নিতে হবে। মিশ্রণ থেকে ছোট ছোট বলের আকারে গড়ে নিতে হবে।
- কড়াইয়ে তেল গরম করে বলগুলো সোনালি-লালচে করে ভেজে তুলে রাখতে হবে।

- অন্য একটি কড়াইয়ে নারকেল কোরা ও চিনি নিয়ে খুব কম আঁচে নাড়তে হবে। মিশ্রণটি যেন তলায় ধরে না যায় এবং রং সাদা থাকে, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।
- নারকেল ও চিনির মিশ্রণে আঠালো ভাব এলে ভেজে রাখা ক্ষীরের গোল্লাগুলো দিয়ে আলতো করে নেড়ে মিশিয়ে নিতে হবে। এরপর আঁচ থেকে নামিয়ে নিতে হবে।
- মিশ্রণটি সামান্য ঠান্ডা হলে হাতে অল্প ঘি মেখে, গরম থাকতে থাকতেই গোল গোল নাড়ুর আকারে গড়ে নিতে হবে। তৈরি ক্ষীরের গোল্লা নাড়ু।







Leave a Reply