
ভাদ্রের মাঝামাঝি এক সকালে বাসে চেপে আমি আর বামমা পৌঁছলাম প্রদীপ কাকুর বাড়িতে। মানিককাকাও সঙ্গে ছিল। প্রদীপ কাকুর মা, বাণী দিদু, যাকে আমরা স্নেহভরে ডাকতাম দিদামনি—ছিলেন বামমার শৈশবের বান্ধবী। বামমার মুখে তাঁর নাম কতবার যে শুনেছি, সেদিনই প্রথম দেখা।
স্টপেজ থেকে একটু পায়ে হেঁটে গ্রামের সরু মাটির পথ ধরে এগোতে হয়। পথের দু’পাশে ধানের ক্ষেত, কিছুটা এগোতেই বাঁশবাগান।
তার গা ঘেঁষে পাশাপাশি দুটো আসাম টাইপের বাড়ি । দু’টো বাড়ির মাঝখানে সরু মাটির পথ, গেটের ধারে একটি শিউলি গাছের গোড়ায় সাদা ফুল ছড়িয়ে আছে।
উঠোনে অনেক বাঁশের ডালা শুকোচ্ছে ঝুড়ি চাপা দেওয়া, তার পাশেই লাল শালু ঢাকা কাচের বয়াম। রান্নাঘরের চুল্লি থেকে ধোঁয়া উড়ে এসে মিশে যাচ্ছে সকালের বাতাসে।
দূর থেকে ভেসে আসছে মোরগের ডাক, আর হাওয়ায় বাঁশপাতার ঝিরঝির শব্দ। বাড়ির পেছন ঘেঁষে বাগানে বাঁশের মাচায় হলুদ কুমড়ো ফুল দুলছে বাতাসে। সেই ফুলেদের ফাঁক গলে উঁকি দিচ্ছে কচি লাউডগা—কোথাও ঝুলে আছে সবুজ দড়ির মতো, কোথাও আবার পাতার আড়ালে আধো লুকিয়ে রয়েছে।

এমন সময় ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন দিদামনি। সাদা নরুনপাড় শাড়ি, মুখভরা উজ্জ্বল হাসি। উঠোনে মাটির দাওয়ায় বিছানো শীতল পাটিতে বসা হলো। কাকিমার হাতে বড় থালা, তাতে সাজানো গরম লুচি, পাশে আলুর তরকারি, আর ছোট কলাই বাটিতে গঙ্গাজলি নারকেল-নাড়ু। রান্নাঘর থেকে কড়াইতে ভাজার ছ্যাঁকছ্যাঁক শব্দ তখনও ভেসে আসছিল। খেতে বসে গল্প আর শেষ হতেই চাইছিল না।
কিন্তু সেই হাসি-আড্ডার আড়ালেও ছিল এক অদৃশ্য ব্যথা—দেশভাগের ক্ষত। কাগজে টানা সীমারেখা একদিন আলাদা করে দিয়েছিল আপন-পর, চেনা-অচেনা। পরিচিত মাটিকে এক রাতে ছেড়ে যাওয়ার সেই যন্ত্রণা শব্দে ধরা কঠিন।
জীবন নদীর মতো বয়ে চলে—নদী যেমন থেমে থাকে না, স্মৃতিও থেমে থাকে না, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে গড়িয়ে যায়। কিন্তু সেই প্রবাহের মাঝেই থাকে কিছু অদৃশ্য বাঁধ, কিছু ক্ষত, যা কখনো শুকোয় না।
সেদিনের সব কথা আর মনে নেই—নয়-দশ বছরের আমার পক্ষে সেসব বোঝাও সম্ভব ছিল না। শুধু মনে আছে, হঠাৎ দুপুরে বৃষ্টি নেমেছিল। বৃষ্টিভেজা উঠোনে শিউলি ছড়িয়ে ছিল, বাঁশগাছের গা বেয়ে টুপটাপ জল গড়াচ্ছিল। ধানক্ষেতে জমা জল, খাল-বিলে ভেসে থাকা লাল-সাদা শাপলার দঙ্গল—সব মিলিয়ে সেই দুপুরে এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা নেমে এসেছিল।
দুপুরের পাত জুড়ে ছিল কচি আমড়া দিয়ে ডাল, শিউলি পাতা ভাজা, কুমড়ো ফুল ভাপা, শাপলা চিংড়ি, চিতি কাঁকড়া ঝাল, আর পেতলের সানকিতে তালের পোয়া পিঠে।

ভাদ্র মাসের মাঝামাঝি হঠাৎ কোনো একদিন, কাছের মানুষ একঝুরি কুমড়ো ফুল নিয়ে এলেই কেন জানি মনে পড়ে যায় সেই দুপুর। মনে পড়ে যায় সেই দুই বান্ধবীর কথা—যাঁদের জীবনের ভাঁজে ভাঁজে রয়ে গেছে দেশভাগের দাগ। আর মনে পড়ে প্রথমবার কুমড়ো ফুল ভাপা খাওয়ার কথা—যার স্বাদ আজও মন ছুঁয়ে যায়।

কুমড়ো ফুল ভাপা
Ingredients
Method
- প্রথমে কুমড়ো ফুলের পরাগরেণু বা পরাগদন্ড অংশ বাদ দিয়ে ভালো করে ধুয়ে নিতে হবে।
- একটি বাটিতে সাদা আর কালো সরষে হালকা গরম জলে ভিজিয়ে রাখুন। ৩-৪ টা কাঁচা লঙ্কা দিয়ে মিহি করে বেটে নিন।
- ১/৪ কাপ নারকেল কোরা মিহি করে বেটে নিন।
- একটি টিফিন বক্সে সর্ষে বাটা, নারকেল বাটা, হলুদ গুঁড়ো, নুন ও চিনি দিয়ে ভাল করে মিশিয়ে নিন।
- কুমড়ো ফুলগুলো দিয়ে ভাল করে মাখিয়ে নিন। বেশ খানিকটা সরষের তেল দিয়ে দিন।
- কম আঁচে ১৫-২০ মিনিট ভাপে রান্না করুন।
- আরও কিছুটা সরষের তেল ছড়িয়ে দিন। বাকি নারকেল কোরা ছড়িয়ে পরিবেশন করুন।
কুমড়ো ফুল ভাপা | ভোরবেলায় তোলা কুমড়ো ফুল, নারকেল-সর্ষে-মেখে মৃদু আঁচে ভাপে রান্না— এই সরল রন্ধনেই লুকিয়ে থাকে বাংলার চিরন্তন স্বাদ।





Leave a Reply