
ঋতুর বদল যখন অধরা থেকে যায়, তখন আমার এই কংক্রিটের শহরকে বড্ড অচেনা লাগে।
বহুকাল আগে ফেলে আসা বাড়ির আনাচে-কানাচে ঘুরে বেড়ায় মন। যেখানে সজনে ফুলের সঙ্গে মিশে থাকে বসন্তকালের ছোঁয়া, আর ভাদ্র এলেই তাল আর দোলনচাঁপার সুবাস।
ভাদ্র মাস।
বাগানের বাঁদিকে দুটো বড় স্থলপদ্মে অনেক ছোট্ট সবুজ কুঁড়ি। তার পাশে জবা গাছগুলো ফুলে ছেয়ে আছে। কুঁড়ি এসেছে জাম্বুরা গাছেতেও। সন্ধে নামলেই তার গন্ধে ছেয়ে যায় গোটা বাড়ি।
শাকসবজি আর ফুলে ঘেরা ছোট্ট বাগানটায় কোনো তালগাছ ছিল না। তাই তালগাছ থেকে তাল পাড়ার গল্পও ছিল না আমাদের। পাকা তাল নিয়ে আসা হতো বাজার থেকে। তাল বাড়িতে এলেই যেন বুঝতে পারতাম—ভাদ্র এসে গেছে।

গন্ধরা বড় অদ্ভুত। কোথা থেকে যে হঠাৎ এসে মনের কুঠুরিগুলো খুলে দেয়, নিজেও টের পাই না আজকাল।
বাড়িতে তাল আসা মানেই বামমার রান্নাঘরে নতুন ব্যস্ততা। ভাঁড়ার ঘর থেকে বের করা হতো সেই বহু বদলের সাক্ষী তালসিঁড়িটা। জলের ছিটে দিয়ে তালের আঁটি চটকে নরম করে, তালসিঁড়িতে ঘষে নিয়ে তালের কাথ বের করা হতো। সেটা আবার পরিষ্কার সাদা সুতির কাপড়ে বেঁধে ঝুলিয়ে রাখা হতো, যাতে তিতো রস আর অতিরিক্ত জল ঝরে যায়।
একটা তালকে রান্নার উপযোগী করে তোলা যেন ঠিক একটি উজ্জ্বল হলুদ-কমলা রঙের কবিতা।
সেই সময়টুকুতে আমার কাজ ছিল রান্নাঘরের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা।
উনুনের আঁচে কড়াই বসত।
তালের মিশ্রণ ধীরে ধীরে ঘন হতো।
নারকেলের গন্ধের সঙ্গে মিশে যেত পাকা তালের সেই ভারী মিষ্টি গন্ধ।
কখনও তালক্ষীর, কখনও সেদ্ধ পুলি।
কলাপাতায় মোড়া পিঠা হতো।
পাটিসাপটাও করা হতো তাল দিয়ে।
তালের বড়া হলে তো আর কথাই নেই।

বামমা সব জানত।
হয়তো বাড়তি দু-চারটে বড়া আলাদা করে রেখে দেওয়া হতো আমাদের জন্য।
কোনও কোনও ভাদ্র দুপুরে বৃষ্টি নামত হঠাৎ।
বাগানের পাতায় টুপটাপ শব্দ।
রান্নাঘরের উনুনে আগুন।
বামমার কড়াইয়ে উজ্জ্বল সোনালি তালের মণ্ড।
করিমগঞ্জের সেই বাড়িটা আর নেই।
বামমার সেই রান্নাঘরও নেই।
নেই সেই তালসিঁড়ি, সেই উনুন, আর কালো কড়াই।
শুধু ভাদ্র ঘুরে আসে।
আর ভাদ্রের কোনও এক সকালে, যখন হঠাৎ বৃষ্টি নামে, আমি তালের রাঘবশাহী সন্দেশ বানাতে বসি।
বৃষ্টি-ভেজা দোলনচাঁপা ফুলের গন্ধ আর তালের গন্ধ মিলে-মিশে মন জুড়ে থাকে আমার।
Ingredients
Method
- তাল ভালো করে ধুয়ে খোসা ছাড়িয়ে আঁটি আলাদা করে নিন।
- আঁটির গায়ে অল্প জল ছিটিয়ে হাত দিয়ে ভালো করে নরম করে নিন। এবার ছাঁকনিতে ঘষে ঘষে কাঁথ বের করুন।
- পরিষ্কার সাদা সুতির কাপড়ে কাঁথ বেঁধে কিছুক্ষণ ঝুলিয়ে রাখুন, যাতে অতিরিক্ত জল ও তিতকুটে রস ঝরে যায়।
- ১½ কাপ ঘন কাঁথ মেপে নিন।
- অর্ধেক শুকনো ঝুরো ক্ষীর কড়াইতে নিয়ে হালকা আঁচে ভাজুন। ক্ষীর থেকে ঘি বের হতে শুরু করলে সেই ঘিতেই ধীরে ধীরে ভাজতে থাকুন।
- ক্ষীর হালকা লালচে/সোনালি পর্যন্ত ভাজা হলে নামিয়ে ঠান্ডা করুন। ঠান্ডা হলে ভালো করে গুঁড়ো করে একেবারে ঝুরঝুরে করে নিন।
- ছানা ভালো করে মেখে মসৃণ করুন।
- কড়াইতে ছানা, অর্ধেক ক্ষীর , চিনি এবং তালের কাঁথ দিয়ে পাক দিতে শুরু করুন। মাঝারি থেকে কম আঁচে ক্রমাগত নাড়তে থাকুন। প্রথমে মিশ্রণটি বেশ নরম থাকবে, তারপর ধীরে ধীরে জল শুকিয়ে ঘন হতে শুরু করবে|
- কড়াইয়ের গা ছেড়ে মণ্ড যখন একসঙ্গে আসবে, তখন আঁচ থেকে নামিয়ে নিন।
- মণ্ডটি সামান্য ঠান্ডা হলে হাত দিয়ে ভালো করে মেখে মসৃণ করুন। একটি পাত্রে ঘি লাগিয়ে চেপে বসান, ছবিতে দেখানো মতন।

- ভাজা ঝুরো ক্ষীর দিয়ে সন্দেশের উপর/চেপে চেপে বসিয়ে দিন । ঠান্ডা হলে, কেটে পরিবেশন করুন ।
তালের রাঘবশাহী সন্দেশ | ছানা, ক্ষীর ও তালের মেলবন্ধনে তৈরি এই সন্দেশটি বামমার রান্নাঘরের রাঘবশাহী সন্দেশের অনুকরণে বানানো।
তাল যদি আপনাদেরও পছন্দের তালিকায় থাকে তাহলে আরোকিছু রান্নার লিংক রইল এখানে|





Leave a Reply