
শহরতলির দুর্গাপুজোগুলোয় ছিল এক আলাদা অনবদ্য অনুভূতি , একধরনের ঘরোয়া উষ্ণতা।
না ছিল এত আলো ঝলমলে প্যান্ডেল, না সেই আড়ম্বর; কিন্তু ছিল চেনা মুখ, পুজোর অঞ্জলি, খিচুড়ি, বন্ধুদের সাথে হুটোপাটি, পুজোয় কার কটা নতুন জামা। সন্ধ্যায় বাপীর হাত ধরে ঠাকুর দেখা যাওয়া ।
সপ্তমীতে নবপত্রিকা স্থাপন , গণেশের কলাবৌ ।
বহু বছর পরে বাপী বুঝিয়ে ছিল,নয়টি ভিন্ন গাছের পাতা ও ডালপালা দিয়ে তৈরি একটি প্রতীকী মাত্র , যা দেবী দুর্গার নয়টি রূপ হিসেবে পূজিত হয়।
অষ্টমী সকালে নতুন জামা পরে অঞ্জলি দেওয়া, বাড়ি ফিরে খিচুড়ি গন্ধে ম ম দালান, সাথে লাবড়া, গরম বেগুনি , ফু দিয়ে খাস – রান্নাঘর থেকে ভেসে আসা মায়ের আওয়াজ ।
গ্যাস বেলুন উড়ে যায় নীল আকাশে, খেলনা বন্দুক হাতে নিয়ে দাদা আর আমার ছুটোছুটি ।
ঝপ করে অষ্টমী ফুরিয়ে নবমী আসে।
আর শুধু একটি মাত্র দিন। পুজোর আগেই বেশি আনন্দ, পুজো এসে যাওয়া মানেই কোথা দিনগুলো শেষ হয়ে যায়- দাদার ছোট্ট মুখ, বই নিয়ে বসার সময় এগিয়ে আসছে।
রাতে পাড়ার পুজোয় গান হেমন্তের কন্ঠে-
নবমী নিশি রে তোর দয়া নাই রে….

পরদিন দশমীর ভোরে বিষাদের সুর, বিদায়ের হাওয়া।
মায়ের হাত ধরে দুর্গা বরণ, সিঁদুর খেলা।
সাদা-লাল পাড় গরদের শাড়ি থেকে ভেসে আসে বসন্তমালতীর গন্ধ।
সিঁদুরে রাঙা মুখে মা, আর আমি গাল ফুলিয়ে বলি
“অসুর কেন সন্দেশের ভাগ পাবে?”
চারদিকে বিষাদের ছায়া , আমি হাপুস নয়নে কাঁদছি।
বাপী মাথায় হাত বুলিয়ে বলতো,
“লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক আর গণেশ— ওরা তো বাবা শিবঠাকুরকে অনেক দিন দেখেনি, তাই তো ফেরার পালা এবার।
ঠিক যেমন তুই মামাবাড়ি গেলে মনখারাপ করিস আমার জন্য।”

পরদিন সেই আমি ভোরবেলা চোখের জল ভুলে আশেপাশে বিজয়ার শুভেচ্ছা প্রনাম জানাতে মশগুল। কার বাড়িতে কি খেতে দেবে ।
কোন কাকিমা ভালো খাস্তা নিমকি আর গুগনি বানায়, তো কোন মাসিমণী গঙ্গাজলি নাড়ু । আবার কোথাও এলো-ঝেলো | সেই নিয়ে দাদায় আমায় জল্পনা শুরু ।
বাঙালির ঘরোয়া মিষ্টির ইতিহাস বহু পুরনো | তাছাড়া তখন তো আমার ছোট্ট শহরতলিতে দোকান থেকে কেনা মিষ্টিতে বিজয়ার চল ছিল না ।
নবমীর সারারাত ধরে রাত মা , বামমা সবকিছু বাড়িতে রাখতো আর সবার মতোই।
নারকেল নাড়ু, কুচো নিমকি, খাস্তা নিমকি, চন্দ্রপুলি , এলো-ঝেলো | সেইগুলো টিনের কৌটায়, কাঁচের বোয়াম ভরে রেখে দেওয়া হতো ।
সাথে থাকতো অনেক সময় ঝাল ঝাল গরম গুগনি । এই ছিল আমার ছোটবেলার দুর্গাপুজো ।
কোনো এক নবমীর রাতে, বহু বছর আগেকার দুর্গাপূজার স্মৃতিরা চুপিচুপি ফিরে আসে, আমি মাটির থালায় এলো-ঝেলো সাজাই ।

এলো-ঝেলো
Ingredients
Method
- প্রথমে একটি পাত্রে ময়দা, নুন, মৌরি গুঁড়ো ও ঘি এক সঙ্গে ভালো ভাবে মিশিয়ে নিন ৩-৪ মিনিট ধরে মেশান যাতে বালির মতো মিশ্রণ তৈরি হয়।
- খুব অল্প অল্প করেই জল যোগ করুন আর ময়ান দিন, যাতে খুব নরম ময়দার তাল না হয়
- মাখা হয়ে গেলে ঢেকে ৩০ মিনিটের জন্য রেখে দিন।
- এবার ময়দার তাল থেকে ১৫-১৬ ছোট ছোট ভাগে ভাগ করুন।
- এর পর লুচির মত পাতলা করে বেলে নিয়ে, একটি ধারালো ছুরি দিয়ে সমান্তরাল করে দুই তিন জায়গায় চিরে নিন শুধু খেয়াল রাখতে হবে যেন ধার গুলো কেটে না যায়, যেভাবে ছবিতে দেখানো হয়েছে ।

- এবার হাত দিয়ে দুই দিক ধরে পেঁচিয়ে ছবির দেখতে মাথাগুলো আটকে দিন।
- একটি কড়াই পর্যাপ্ত সাদা তেল নিন এবং তেলটি ভালোভাবে গরম করুন। মাঝারি আঁচে এলোঝেলো গুলো ডুবো তেলে ভেজে নিন। এগুলো হালকা বাদামী রঙের এবং ভেতর থেকে খাস্তা হতে হবে।
- একটি অন্য কড়াই চিনি, ১/২ কাপ জল , আর এলাচ গুঁড়ো দিয়ে একটি আঠালো সিরাপ করুন।
- দুই তাঁর যুক্ত চিনির সিরাপ হলে ভাজা এলোঝেলো চিনির সিরাপ লাগিয়ে তুলে রাখুন । চিনির সিরাপ সম্পূর্ণ শুকাতে দিন।
এলো-ঝেলো। দুর্গাপুজো সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকা এই মিষ্টি ছাড়া আজও আমার বিজয়া অসম্পূর্ণ।





Leave a Reply